১। গাড়ি কোথায় থেকে কিনবেন?
আমাদের দেশে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি গুলোর বিশাল মার্কেট বসে কার হাট গুলোতে, কিন্তু সত্যি কথা বলতে এখান থেকে গাড়ি নিলে আপনার ঠকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। এছাড়াও অনেকে বিক্রয় ডটকম থেকে বা কোনো একক ব্যক্তির কাছ থেকে গাড়ি কিনে থাকেন, কিন্তু এতে কিছু সমস্যা রয়েছে। যখন আপনি কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে গাড়ি কিনবেন, সে আপনাকে বিক্রয় পরবর্তী সেবা বা After sell service দিবে না, এতে গাড়ির কোনো সমস্যা বের হলে আপনাকে নিজ খরচে গাড়ি সারাতে হবে। যদি আপনি প্রথম গাড়ি কিনে থাকেন তাহলে আপনার কোনো গাড়ির গ্যারেজের সাথে পরিচয় থাকবে না। গাড়ি সারানোর জন্য একটি বিশ্বস্ত গ্যারেজ প্রয়োজন৷ ভুল গ্যারেজ থেকে গাড়ি সারালে কর্মিরা ১৫০০ টাকার কাজকে ৫০০০ টাকার কাজ বানিয়ে ফেলতে সক্ষম আপনার চোখের সামনেই। তাই গাড়ি কিনবেন রিকন্ডিশন্ড গাড়ির সোরুম গুলো থেকে। এতে যেমন কয়েক মাস ফ্রী সার্ভিস পাবেন তেমনি কোনো সমস্যা হলে সোরুম থেকেই সারিয়ে নিতে পারবেন। আর যদি তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে পারেন তারা নিজ দায়িত্বেই আপনার গাড়ি অন্য সময় সঠিক ভাবে সার্ভিস করিয়ে দিবে।
২। গাড়ির রং
গাড়ির রং, গাড়ির অনেক ক্ষয়ক্ষতি লুকিয়ে রাখতে সক্ষম। অনেক সময় গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট, গাড়িতে বড় ডেন্ট রেখে যায়, যা পরবর্তীতে সারিয়ে তোলা সম্ভব হয়না, এসময় গাড়ির ঐ জায়গাতে পুডিং লাগিয়ে ভরাট করে লেবেল করে পুনরায় রং করিয়ে নেওয়া হয়, এতে গাড়ির রঙের নীচে বড় ডেন্ট গুলি লুকিয়ে ফেলায় হয়। এক্ষেত্রে গাড়ির রঙের পুরুত্ব মাপার একটি ছোট যন্ত্র রয়েছে। আমাদের দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান রিকন্ডিশন্ড গাড়ি কিনার সময় ক্রেতা কে গাড়ি পরিদর্শক হিসাবে একজন ওয়ার্কার দিয়ে সাহায্য করে থাকে, তাদের সহায়তা নিলে তারা উক্ত যন্ত্র সাথে করেই নিয়ে আসে।
৩। গাড়ি টেস্ট ড্রাইভ
গাড়ি কিনার সময় অবস্যই টেস্ট ড্রাইভ করিয়ে নিবেন। যদি আপনার পরিচিত কেউ থাকে, যে গাড়ি সম্পর্কে ভালো জানে তাহলে তাকে সাথে করে নিয়ে যাবেন এবং টেস্ট ড্রাইভে তাকেই গাড়ি চালাতে দিবেন।
টেস্টড্রাইভে যাওয়ার সময় যা যা খেয়াল করবেন
২। নড়া চড়া :গাড়িতে কোন রকম অস্বাভাবিক নড়াচড়া, হঠাৎ থেমে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষ্য করলে সাথে সাথে বুঝে নেবেন গাড়িতে খারাপ ইঞ্জিন জনিত সমস্যা রয়েছে । গাড়ি যদি থেমে থেমে পপিং এন্ড রকিং (একটি ডান্স মুভের নাম) মুডে থাকে তাহলে তো ব্যাপক সমস্যা । এ ধরনের সমস্যা হয় মূলত নষ্ট স্পার্ক প্লাগ , জ্বালানি পাইপে ময়লা অথবা গাড়ির প্রধান নিয়ন্ত্রণ পার্টসে কোন সমস্যা ইত্যাদি কারনে। এছাড়াও গাড়ির পিছনের সিটে বসে যদি পাশা পাশি একটা নড়াচড়া লক্ষ্য করেন তাহলে বুঝবেন টায়ারের রিমে সমস্যা রয়েছে।
৩। বাজে গন্ধ আসছে কিনা: গাড়ির ভেতরে বসে কিছু খেলে বাজে গন্ধের সৃষ্টি হতে পারে।কিন্তু খারাপ ইঞ্জিন ও এর গন্ধ পুরাই অন্যরকম। এই ধরনের গন্ধ এক হতে পারে আপনার গাড়ির তেল অথবা কুল্যান্ট লিক করছে , আরেক হতে পারে এক্সহস্ট গ্যাস লিক হয়ে আপনার গাড়ির ইন্টেরিওরে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
৪। গিয়ার বক্স: গাড়ি টেস্ট ড্রাইভে থাকার সময় গাড়ি গিয়ার সঠিক ভাবে পরিবর্তন হচ্ছে কিনা খেয়াল করবেন, যদি গাড়ি অটো গিয়ারের হয়ে থাকে, এবং গ্যাস প্যাডেলে চাপ দিলে যদি শব্দ হয় কিন্তু গতি না বাড়ে তাহলে গাড়িরর গিয়ার বক্সে সমস্যা আছে।
৫। গাড়ির ইলেক্ট্রিক পার্টস ও সেন্সর: গাড়ি তেল/ গ্যাসে চালানো যন্ত্র হলেও এগুলো কে সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সেন্সর ও ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি ব্যাবহার করা হয়। অনেক সময় রিকন্ডিশন্ড গাড়ি গুলোর অয়ারিং এ সমস্যা থাকে।যেমন : আজকাল বেশির ভাগ গাড়িতেই সাউন্ড সিস্টেম, নোটিফিকেশন লাইট, মিটার লাইট, ডিভিডি প্লেয়ার, মনিটর, ব্যাক ক্যামেরা থাকে যদি এগুলোর অয়ারিং ঠিকমত করা না হয় তবে এগুলো আপনাকে ঠিক মত সার্ভিস দিবে না। এছাড়াও গাড়িতে তেল/গ্যাসের পরিমান বোঝানোর সেন্সর ও ইন্টিকেটর ব্যাবহার করা হয়, অনেক সময় এগুলো সঠিকভাবে কাজ করেনা, বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারনে, তাই গাড়ি কিনার সময় এগুলো সঠিক ভাবে কাজ করছে কিনা তা দেখে কিনা উচিত।
৬। এসি : গাড়িতে আরামদায়ক ভ্রমনের জন্য এসি প্রয়োজন, যদি এসিতে গ্যাস কম থাকে বা কম্প্রেসর দুর্বল হয়ে যায় তাহলে এসি, গাড়ির ভিতরের পরিবেশকে ঠিকমত ঠান্ডা করতে পারবেনা, ঠান্ডা হতে যেমন বেশি সময় লাগবে, তেমনি ঠান্ডা করতে কম্প্রেসরকে বেশী কাজ করতে হবে ফলে আপনার জ্বালানি ও বেশি পুড়বে। তাই গাড়ি কিনার আগে অবশ্যই এসি ভালোমত চেক করে নিবেন।
টেস্টড্রাইভের পর যা যা লক্ষ্য করবেন।
গাড়িতে ফ্লুইড লিক করছে কিনা।
১। পাওয়ার ওয়েল লিক: টেস্ট ড্রাইভ থেকে আসার পর যখন পার্কিং করবে তখন স্টিয়ারিং টি একবার সম্পুর্ন বামে এবং ডানে ঘুরাবেন দেখবেন নীচে (লাল/ কোকাকোলা রং এর) কোনো তেল পড়ছে কিনা, যদি পড়ে তাহলে বুঝবেন পাড়ির পাওয়ার অয়েল লিক করছে। পাওয়ার অয়েল কেনো লিক করে দেখতে নিচের বাটনটিতে ক্লিক করুন।
২। গাড়ির ইঞ্জিন অয়েল লিক: গাড়িটি পার্কিং করা অবস্থায়, গাড়ি নিউট্রালে রেখে, গাড়ির সামনের হুড উঠিয়ে, গাড়ির গ্যাস প্যাডেলে চাপ দিতে হবে, খেয়াল করবেন ইঞ্জিনের গা বেয়ে তেল পড়ছে কিনা, যদি পড়ে তাহলে হতে পারে ইঞ্জিনের গ্যাসকেট কেটে গেছে।
৩।গাড়ির ধোঁয়া: গাড়ি থেকে ধোঁয়া বের হওয়া ভালো লক্ষন না। গাড়ি থেকে ধোঁয়া বের হওয়া ইঞ্জিনের সমস্যার প্রতি ইঙ্গিত করে ধোঁয়ার রঙের ওপর নির্ভর করে আপনি বুঝে নিতে পারেন গাড়িতে আসলে কি সমস্যা হয়েছে।
- নীল রঙের ধোঁয়া: নীল রংয়ের ধোঁয়া বের হওয়ার অর্থ হচ্ছে ইঞ্জিনের ভেতর থেকে তেল অন্য কোন ভাবে বের হচ্ছে এবং জ্বালানির সাথে পুড়ছে। আর এই জ্বালানি পোড়ার ব্যপার বন্ধ করতে সব সময় আপনার ক্র্যান কেসে ইঞ্জিন অয়েল দিয়ে রাখতে হবে। তবে সবথেকে বেশী ভালো হয় যদি আপনি আপনার গাড়িটি কোন মেকানিকের কাছে নিয়ে যান আর গাড়ির নির্দিষ্ট লিকেজ সারিয়ে তোলেন।
- সাদা ধোঁয়া : সাদা ধোঁয়া, গাড়ি ওয়ার হিটিং এর লক্ষ্মণ। যদি গাড়ির হুডের নিচ থেকে ধোঁয়া বের হয় তাহলে বুঝতে হবে আপনার গাড়ির ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরম হয়ে গিয়েছে ।গাড়ি অতিরিক্ত গরম হলে, সাধারণত টেইল পাইপ থেকে আগে ধোঁয়া বের হয় পরে গাড়ির হুডের নিচ থেকে ধোঁয়া বের হয় । ইঞ্জিনে একেবারেই কোন কুল্যান্ট জাতীয় তরল না ঢাললে এধরনের সমস্যা হতে পারে।
এবার যা যা লক্ষ্য করবেন।
১। গাড়ির দরজা বন্ধ করার সময় শব্দ:
গাড়ির দরজ বন্ধ করার সময় যদি ঝ্যানঝ্যান আওয়া করে বুঝবেন গাড়ির দরজার রাবার গুলোর আয়ু ফুরিয়ে গেছে। এমন হলে বাইরের শব্দ, পানি, বাজে গন্ধ গাড়ির মধ্যে সহজেই প্রবেশ করবে।
২। গাড়ির হেড রেস্ট:
অনেকময় আমরা গাড়ির হেড রেস্টেটি চেক করতে ভুলে যা, কিন্তু এই হেড রেস্ট গুলে অনেক সময় ভাঙা থাকতে পারে।
৩। গাড়ির টায়ার :
গাড়ি কিনার সময় টায়ারের অবস্থা দেখে কিনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি গাড়ি কিনার ১ মাস না যেতেই গাড়ির টায়ার পরিবর্তন করতে হয় তাহলে বিষয়টি অত্যান্ত বিরক্তিকর। ভালো টায়ার বুঝার জন্য টায়ারের গ্রিপ গুলো (খাজ কাটা) গুলো কেমন আছে দেখেত নিতে হবে, যদি খাজ না থাকে বা সমান হয়ে যায় বা স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে তাহলে টায়ার খারাপ রয়েছে, এটি চেঞ্জ করতে হবে। আবার অনেক সময় আগের সমান হয়ে যাওয়া টায়ারে পুনরায় খাজ কাটা হয় এতে কোনো বাজে রাস্তায় বা অল্প আঘাতে টায়ার বাস্ট করতে পারে। তাই ঠায়ারের মেইন বডি থেকে বিটের উচ্চতা কত টুকু সেটা ভালো করে লক্ষ্য করতে হবে। এছাড়াও গাড়িতে বাড়তি টায়ার দেওয়া আছে কিনা দেখতে হবে।
৪। টুলস:
গাড়ি সারানোর বা টায়ার পাল্টানোর জন্য গাড়ির সাথে কোন টুলস দিচ্ছে কিনা দেখতে হবে।
৫। লাইট:
গাড়ির সব গুলো লাইট সঠিক ভাবে জ্বলছে কিনা দেখতে হবে, যদি না জ্বলে তবে ব্যাটারীর সমস্যা থাকতে পারে।
৬। গাড়ির রঙ:
রঙ সব জায়গায় একই রকম কিনা দেখতে হবে, যেমন যদি সাদা রঙের গাড়ি হয় তবে গাড়ির সব জায়গায় সাদা একইরকম নাকি কোন একটা বা দুটো জায়গা রঙ একটু অন্য রঙের দেখতে হবে, যদি রঙের পার্থক্য থাকে তাহলে গাড়ি পেইন্ট করা হয়েছে কিন্তু সঠিক ভাবে করা হয়নি এক্ষেত্রে গাড়ির সৌন্দর্য পুরোটােই নষ্ট। দরকার হলে গাড়ির ছবি তুলে দেখতে পারেন, অনেকসময় খালি চোখে বা কাছ থেকে পার্থক্যটা বুঝা যায় না।
৭। এক্সিডেন্ট
গাড়ির কোন এক্সিডেন্ট হিস্ট্রি আছে কিনা জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
৮। কাগজপাতি:
কাগজপাতি আপডেট আছে কিনা, মালিকের ঠিকানা, ফোন নাম্বার, ট্যাক্স টোকেন আপডেট আছে কিনা জেনে নিবেন
৯। রাইড শেয়ার :
যদি উবার বা অন্য কোনো রাইডশেয়ার মাধ্যমে গাড়ি চালানোর জন্য গাড়ি কিনে থাকেন তাহলে গাড়িটির মালিক গাড়িটি উবারে দিয়েছিল কিনা জানা প্রয়োজন, কারন মালিক গাড়িটি উবারে দিয়ে থাকলে, উবারের সাথে মালিকের চুক্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি গাড়িটি উবারে দিতে পারবেন না।
ওপরের টিপস্ গুলোই সব নয়, তবে টিপস্ গুলো আপনাকে প্রাথমিক ভাবে সঠিক গাড়িটি বেছে নিতে সাহায্য করবে, উপরের টিপস্ এর পরেও আপনি নিজের মত করে চেক করে নিতে পারেন।
